আক্কেল দাঁত নিয়ে যত প্রশ্ন

আক্কেল দাঁত নিয়ে যত প্রশ্ন

সদ্য কৈশোর পার করা এবং যুবাদের মধ্যে আক্কেল দাঁত একটি বড় যন্ত্রণার নাম। মোটামুটি 18-25 বছর বয়স এর মধ্যে আক্কেল দাঁত সবচেয়ে বেশি সমস্যা করে থাকলেও পরবর্তী জীবনের যেকোন পর্যায়ে আক্কেল দাঁত সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। আজ আমরা বিস্তারিত কথা বলব আক্কেল দাঁত নিয়ে। এবং এ নিয়ে কমন কিছু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব যা প্রায় প্রতিনিয়ত রোগীরা জিজ্ঞেস করে থাকেন।

কেন আক্কেল দাঁত অন্যান্য দাঁতের চেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি করে?

১. দেরিতে ওঠা।

আমাদের আক্কেল দাঁত অন্যান্য দাঁতের অনেক পরে ওঠে। ততদিনে চোয়ালের হাড় ও টিস্যু পরিণত হয়ে যায়। আর আক্কেল দাঁতকে এই পরিণত হাড় ও টিস্যুকে ভেদ করে উঠে আসতে হয়। তাই ব্যাথাও তুলনামূলকভাবে বেশি হয়।

২. আঁকাবাঁকা হয়ে ওঠা

মানুষের চোয়ালে বত্রিশ টি দাঁত থাকলেও মানুষের চোয়ালে আসলে বত্রিশ টি দাঁতকে সুন্দরভাবে পাশাপাশি রাখার মত জায়গা থাকে না বেশিরভাগ সময়। বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় মানুষের চোয়াল ক্রমশ ছোট হয়ে এসেছে। এজন্য আক্কেল দাঁত বেশিরভাগ সময় বাঁকা হয়ে ওঠে। এই লেখার নিচের অংশে কিছু ছবি দেওয়া আছে যা দেখলে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন আপনারা। এই আঁকাবাঁকা হয়ে ওঠার দরুন এরা চোয়ালে পুরোপুরি আসতে পারে না। আংশিক উঠে ওই অবস্থায় পড়ে থাকে। এই আংশিক ওঠা দাঁতের চারপাশে প্রদাহ সৃষ্টি হয় যাকে pericoronitis বলা হয়।

৩. পরিষ্কার করা কঠিন

আক্কেল দাঁত যদি কোনরকমে চোয়ালে উঠেও যায় সেটা এমন জায়গায় ওঠে যেখানে সাধারণত আমাদের ব্রাশ ভালোমত পৌঁছায় না। ফলে এই দাঁত সহজেই ক্যারিজ ও pericoronitis এর শিকার হয়।

সমস্যা না করলেও সকল আক্কেল দাঁত কি ফেলে দিতে হয়?

আক্কেল দাঁত মুখে তিনটি অবস্থায় থাকতে পারে।
১। হাড় ও মাড়ি দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে থাকা অবস্থায়। এরকম অবস্থায় সাধারনত দাঁত খুব বেশি সমস্যা করে না মাঝে মাঝে সামান্য ব্যাথা ছাড়া। এক্ষেত্রে দাঁত ফেলা জরুরী নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এরকম দাঁত থেকে ডেন্টিজেরাস সিস্ট(dentigerous cyst) হতে পারে৷

এরকম অবস্থায় দাঁত থাকলে সেটা বছরখানেক পরপর চেক করানো উচিত। যদি কোন ফোলা দেখা যায় তবে দ্রুত ঐ মুহূর্তেই ডেন্টিস্ট দেখানো উচিত। তাছাড়া মধ্যবয়সে এসে অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিস , হার্ট এর সমস্যা ইত্যাদি শুরু হলে আক্কেল দাঁত ফেলা জটিল হয়ে পড়ে। তাই অনেকে appendisectomy এর মত আক্কেল দাঁত সুবিধাজনক সময়ে ফেলে দেবার পরামর্শ দেন যাতে পরবর্তীতে জটিলতা না হয়।

২। দাঁত অর্ধেক উঠে থাকা। এরকম ক্ষেত্রে ব্যাথা ও অন্যান্য সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। এর থেকে পূজ জমে Laudwig’s angina হতে পারে যা খুবই কষ্টদায়ক একটি সমস্যা এবং কখনো কখনো জীবনঘাতী হতে পারে। এছাড়াও এই আক্কেল দাঁত থেকে সামনের ভালো দাঁতে সমস্যা ছড়াতে পারে(নিচের ছবির মত)।

এরকম দাঁত ফেলে দেয়াই সর্বোত্তম।

৩। দাঁত পুরোপুরি উঠে আসা। যদি দাঁত পুরোপুরি মুখগহ্বরে দেখা যায় তবে এরকম দাঁত সমস্যা কম সৃষ্টি করে। এরকম দাঁত নিয়মিত যত্নেই ভালো থাকে।

আক্কেল দাঁত তুললে কি চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে যাবে?

সহজ উত্তর হল না। এই বিষয় নিয়ে আমাদের এই লেখায় বিস্তারিত বলা হয়েছে।

আক্কেল দাঁত তোলার কি তাহলে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই?

আক্কেল দাঁত ফেলার একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তবে সেটা খুবই নগণ্য ও গুরুত্বহীন বলা যায়। এটাকে বলা হয় neuropraxia । আক্কেল দাঁত আমাদের চোয়ালের স্নায়ুর খুব কাছাকাছি থাকে। তাই এই দাঁত তোলার সময় সেই স্নায়ুতে সামান্য ইনজুরি হতে পারে। তখন নিচের ঠোঁটে ও জিহ্বায় অনুভূতি একটু ঝিমঝিম মনে হতে পারে। এর পরিমাণ খুবই সামান্য এবং বছরখানেকের মধ্যে এটি হয় সেরে যায় নাহয় রোগী এটাকে অগ্রাহ্য করে প্রায় ভুলেই যান।

আক্কেল দাঁত ফেললে খাবার খেতে অসুবিধা হবে কি?

না। আক্কেল দাঁত বেশিরভাগ সময় আমাদের খাবার কাজে খুব একটা সাহায্য করে না। তবে যদি কারো মাড়ির কিছু দাঁত ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে এবং ডেন্টিস্ট মনে করেন যে আক্কেল দাঁত খাবার খেতে দরকারি সেক্ষেত্রে তিনি সেটি রাখার পরমার্শ দিতে পারেন।

আক্কেল দাঁত রেখে দিলে কি সমস্যা হতে পারে?

আক্কেল দাঁত ,বিশেষ করে যদি সেটি ইতিমধ্যে ক্যারিজ বা pericoronitis এর শিকার হয়ে থাকে, তবে সেটাকে চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। এই দাঁত থেকে ইনফেকশন খুব সহজেই আমাদের গলায় চলে এসে Ludwig’s angina নামের একটি রোগের সৃষ্টি করতে পারে যা মেডিকেল ইমার্জেন্সী। এর ফলে রোগীর প্রচণ্ড ব্যথার সাথে সাথে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। এর চিকিৎসাও রোগীর জন্য বেশ যন্ত্রণা দায়ক। নিচে এর ছবি দেওয়া হলো।

তাহলে কি আক্কেল দাঁত ফেলেই দেব?

এর জন্য সবচেয়ে ভালো উপদেশটি আপনি পাবেন আপনার নিকটস্থ ডেন্টাল সার্জন এর কাছে। তিনি আপনার সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আপনাকে সঠিক উপদেশ দিতে পারবেন। অনেকেই জানেন না যে প্রায় প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ একজন ডেন্টাল সার্জন নিযুক্ত আছেন। অনেক সময় যন্ত্রপাতি স্বল্পতার দরুন তারা সব সেবা দিতে পারেন না। কিন্তু আপনারা দাঁত ও মুখের যেকোন সমস্যায় উপদেশ ও পরামর্শ পেতে তার সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

সবাই ভালো থাকবেন। দাঁত ও মুখের যত্ন নেবেন। দাঁত ও মুখের সমস্যায় রেজিস্টার্ড ডাক্তার এর শরণাপন্ন হবেন।

Leave a Reply