কেন বেশিরভাগ দাঁত ও মুখের সমস্যা শুধু ঔষধে ঠিক হয় না।

কেন বেশিরভাগ দাঁত ও মুখের সমস্যা শুধু ঔষধে ঠিক হয় না।

এরকম রোগী আমরা হরহামেশাই পাই যারা বলেন “দাঁতের সমস্যার জন্য অনেকদিন ঔষধ খেয়েছি। ঔষধ খেলে ভালো থাকে, ঔষধ থামালেই আবার সমস্যা বাড়ে।”

এটা একটা ভুল ধারনা যে ঔষধ দাঁতের সমস্যাকে থামিয়ে রাখতে পারে বা কমিয়ে ফেলতে পারে। দাঁত ও মুখের সমস্যায় যেসব ঔষধ সাধারনত রোগীরা খেয়ে থাকেন তা শুধুমাত্র রোগের উপসর্গ বা সিম্পটম কমিয়ে রাখে। যেমন ব্যাথা, ফোলা ইত্যাদি। কিন্তু দাঁতের ক্ষয় বা নষ্ট হওয়া আটকাতে এসব ঔষধ কার্যকর নয়। দাঁতের ক্ষয় কিংবা ইনফেকশন এর চিকিৎসা না করে শুধুমাত্র ঔষধে সমাধান সম্ভব নয়। এসব ঔষধ শরীরের অন্যান্য রোগ সারাতে কার্যকরী হলেও দাঁত ও মুখের চিকিৎসায় শুধুমাত্র সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

আসুন দেখা যাক কেন এমনটা হয়। আমি নীচে খুব সহজ ভাষায় ও ইনফোগ্রাফ এর মাধ্যমে সেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি।

ঔষধ কীভাবে কাজ করে

প্রথমেই জেনে রাখুন যে এন্টিবায়োটিক ঔষধ একা কখনো জীবানু সম্পূর্নরূপে ধংস করতে পারেনা। এর সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধকারী কোষ ও এন্টিবডি(মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জীবাণুনাশক কেমিক্যাল) কাজ করতে হয়। ঔষধের কার্যকরী হবার প্রধান শর্ত হল ইনফেকশন যেখানে হয়েছে সেখানে ঔষধ,রোগ প্রতিরোধকারী কোষ ও এন্টিবডি ইত্যাদির পৌঁছতে পারা। আর এই পৌঁছানোতে মূল ভূমিকা পালন করে মানুষের রক্ত। শরীরের প্রায় সকল জায়গায় রক্ত সঞ্চালিত হয়।

এই রক্তে স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধক কোষ ও এন্টিবডি থাকে যারা ছোটখাটো ইনফেকশন নিজেরাই সারাতে পারে ও সামান্য কাটা ছেড়া/ ভাঙা নিজেই ঠিক করে নিতে পারে। এজন্যেই ভাঙা হাড় জোড়া লাগে, কাটাছেড়া সেরে যায়। ইনফেকশন এর মাত্রা যদি বেশী হয় তখন সার্জারি এবং ঔষধের প্রয়োজন হয় আর ঔষধ এই রক্তের মাধ্যমে জীবাণু আক্রান্ত জায়গায় পৌঁছে এবং জীবাণু ধ্বংসে কাজ করে।

কিন্তু মানুষের শরীরের কিছু বিশেষ জায়গা আছে যেখানে রক্ত সঞ্চালন থাকে না। যেমন চুল, নখ, দাঁত ইত্যাদি। দাঁতের ভেতরে মজ্জায় সামান্য কিছুটা রক্ত সঞ্চালন থাকলেও দাঁতের বাকী বেশিরভাগ অংশেই রক্ত সঞ্চালন থাকে না।

দাঁত প্রায় পুরোটাই কঠিন মিনারেলাইজড। আর যেসব জায়গায় রক্ত সঞ্চালন থাকেনা তাকে সরাসরি ঠিক করার ক্ষমতা শরীরের নেই। এজন্যেই দাঁত ভেঙে গেলে বা দাঁতে ক্ষয় হলে তা কখনই নিজে নিজে কিংবা ঔষধে ঠিক হয় না। দাঁত ক্ষয় বা ডেন্টাল ক্যারিজে যেসব ব্যাকটেরিয়া থাকে তারা প্রায় বিনা বাধায় দাঁতকে নষ্ট করতে কাজ করে। একমাত্র দাঁত ও মুখ পরিষ্কার রাখা ও নিয়মিত ব্রাশ করে ক্যারিজ থেকে বেচে থাকা সম্ভব।(ক্যারিজ বা দাঁত ক্ষয় নিয়ে আমাদের এই পোস্টটি পড়তে পারেন)। আর একবার ক্যারিজ শুরু হলে তা বাড়তেই থাকে এবং একসময় দাঁতের মজ্জায় পৌঁছে যায়।

দাঁতের মজ্জায় রক্ত সঞ্চালন যেটুকু আছে তা জীবাণুর বিরুদ্ধে সামান্যই প্রতিরক্ষা দেয়। এসময় রোগীরা প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করে থাকেন। একসময় মজ্জা নিজেই নষ্ট হয়ে যায় এবং ব্যাথাও কমে আসে। কিন্তু দাঁত এর ভেতরের ফাঁকা অংশ তখন জীবাণুদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে দাড়ায়। কারনটা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পারছেন। কারণ দাঁতের ভেতরের ফাকা অংশেও তখন আর রক্ত সঞ্চালন থাকে না। ফলে জীবানুরা সেখানে বহাল তবিয়তে থাকতে পারে।

কি হয় যখন আপনি ঔষধ খাওয়া থামান

যতদিন আপনি ঔষধ খান ঔষধ আপনার সমস্ত শরীরে জীবাণুদের বিরুদ্ধে কাজ করে। তখন জীবাণুরা দাঁতের ভেতরের ফাকা অংশে আশ্রয় নেয়।

আবার যখন আপনি ঔষধ বন্ধ করেন, তারা বের হয়ে এসে নতুন করে ইনফেকশন তৈরি করে। এর থেকে বড় ধরনের ইনফেকশন যেমন স্পেস ইনফেকশন (cellulitis) জীবাণুদের রক্তে ছড়িয়ে পড়া (septicemia) হতে পারে। এবং প্রত্যেকবার এই ব্যাক্টেরিয়াগুলো আগের চেয়ে বেশী শক্তিশালী হয়ে আসে। আপনি যেই এন্টিবায়োটিক আগে খেয়েছিলেন সেটা তখন আর কাজ করতে চায় না। একে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বলে। তাই এধরনের সমস্যায় একমাত্র চিকিৎসা হল জীবাণুদের সম্পূর্ণরূপে সরিয়ে সেই দাঁতকে আগের আকারে নিয়ে আসা অথবা । এটা ফিলিং কিংবা রুট ক্যানাল এর মাধ্যমে করা যায়। খুব বেশী দাঁত ক্ষয় হয়ে গিয়ে থাকলে দাঁত ফেলে দেয়া উচিত।

কি হয় যখন আপনি ক্রমাগত ঔষধ খেতে থাকেন

একটু আগেই যেমনটা বলেছিলাম যে চিকিৎসা না করিয়ে ক্রমাগত ঔষধ খেলে জীবাণুরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এটি ভয়ংকর একটি ব্যাপার এই জন্য যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে আগামী শতাব্দীতে সবচেয়ে বেশী মানুষ মারা যাবে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট জীবানুর দ্বারা (বিস্তারিত পড়ুন এখানে)। অর্থাৎ যেহেতু এন্টিবায়োটিক এর সংখ্যা সীমিত, এবং জীবাণুরা ক্রমাগত এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হয়ে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে দেখা যাবে সামান্য রোগেই মানুষ মারা যাচ্ছে কারন তার শরীরে কোন এন্টিবায়োটিক কাজ করছে না। আর এতক্ষনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে কেন দাঁত ও মুখের বেশিরভাগ সমস্যায় শুধুমাত্র ঔষধ খাওয়া তেমন কোন কাজে আসবে না বরং ক্ষতিই করবে। সুতরাং রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোন ঔষধ খাবেন না। এবং যেই রোগে সার্জারি বা অন্য চিকিৎসা লাগবে সেটাকে ঔষধ খেয়ে চাপিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না।

এছাড়াও

জীবাণুঘটিত ছাড়াও অনেক রোগ যেমন আলসার, সিস্ট,টিউমার ইত্যাদির শুধু ঔষধে ভালো হবার সম্ভাবনা নেই। আলসার/সিস্ট এর কারন বের করে তার চিকিৎসা করতে হবে, কিংবা টিউমার সার্জারি করে ফেলতে হবে। তবেই সমাধান হবে।

তার মানে কি দাঁত ও মুখের কোন সমস্যাই শুধু ঔষধে সারে না?

হ্যাঁ। দাঁত ও মুখের অনেক সমস্যাই শুধুমাত্র ঔষধে সেরে যায়। তবে আনুপাতিক হারে সেসব রোগের প্রাদুর্ভাব কম। তাই সবসময় দাঁত ও মুখের সমস্যায় রেজিস্টার্ড ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। ডাক্তারই সিদ্ধান্ত দেবেন যে রোগটি কি কারণে হচ্ছে এবং তার চিকিৎসা কি।

সবাই ভালো থাকুন। দাঁত ও মুখের যত্ন নিন।

Leave a Reply